বাংলাদেশ ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ৪৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের GDP অর্জনের পথে। কল্পনা করা যায়, যদি শুধু সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ থেকেই দেশের GDP ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাত! ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমা আমাদের সামনে বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে রেখেছে।
বাংলাদেশ সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনার এক নবীন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। তবে ব্লু ইকোনমিবাস্তবায়নের আগেই জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে উপকূলীয় সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষা। সমুদ্র-নির্ভর খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীলতা, উপকূলীয় বাস্তুসংস্থান এবং লাখো মানুষের জীবিকা—সবকিছুই নির্ভর করে বঙ্গোপসাগরের প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর। অথচ মানবসৃষ্ট চাপ, দূষণ, অব্যবস্থাপনা ও জলবায়ুপরিবর্তনের প্রভাবে এই ভারসাম্য ক্রমাগত ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বঙ্গোপসাগরে রয়েছে মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি, প্রবাল, ম্যানগ্রোভ, সী-গ্রাস এবং সামুদ্রিক প্রাণীর বিশাল এক জীববৈচিত্র্যের ভান্ডার। উপকূলীয় মানুষদের অধিকাংশ জীবিকা নির্ভর করে এই ইকোসিস্টেম এর সুস্থ পরিচালনার উপর। কিন্তু জলবায়ুপরিবর্তন, প্রজননক্ষেত্রে অনুপ্রবেশ, অটেকসই আহরণ পদ্ধতি, প্লাস্টিক ও শিল্পবর্জ্যের দূষণ এবং উপকূলীয় ভূ–ব্যবহারের পরিবর্তন যেমন বাস্তুসংস্থান ধ্বংস করছে, তেমনি মানুষের জীবিকার উপরও প্রভাব ফেলছে। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে। চলমান কিছু সংরক্ষণ পদক্ষেপ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মেরিন প্রোটেক্টেড এরিয়া(MPA) ঘোষণা, মৌসুমি মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা, ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের জন্য খাদ্য সহায়তা, ট্রলিং জোন নির্ধারণ ইত্যাদি। এছাড়াও সরকারি ভাবে আরও বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও তা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। এমতবস্থায় সরকারি সংস্থার সবচেয়ে বেশি যেদিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত তার মধ্যে একটি হলো উপকূলীয় জনগণের অংশগ্রহণ। উপকূলীয় জনগোষ্ঠী শুধুই সম্পদ আহরণকারী নয়—তারা এই সম্পদের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রক্ষক। স্থানীয় জেলেরা দিন-দিন উপলব্ধি করছেন যে প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখা কিংবা কম বয়সী মাছ না ধরার মতো পদক্ষেপ তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। সরকারি সংরক্ষণ নীতিমালার সাথে তাদের অংশগ্রহণ যুক্ত করলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন পাওয়ার সম্ভব। যেমন কক্সবাজার, নোয়াখালী, পটুয়াখালী ও ভোলার বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে সম্প্রদায়-নেতৃত্বে “কমিউনিটিমনিটরিং গ্রুপ” গড়ে উঠেছে, যা নীতি বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। আবার সুন্দরবনসংরক্ষণে “Co-Management” ইকোসিস্টেম তৈরি করা হচ্ছে। উপকূলীয় মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু এই নীতি বাস্তবায়নে রয়েছে বেশি কিছু প্রতিকূলতা এবং দুর্বলতা। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সম্প্রদায়কে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্তর্ভুক্ত না করা, পর্যন্ত তথ্যের ঘাটতি, বিকল্প জীবিকা উন্নয়নে দুর্বলতা, আইন প্রনয়নে অদৃশ্যমানতা ইত্যাদি। সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং অর্থনীতিকে বেগবান রাখতে অবশ্যই গঠনমূলক নীতিব্যবস্থা পরিচালনা করতে হবে। টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয় – সম্প্রদায়-নেতৃত্বাধীন কো-ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিকভাবেঅন্তর্ভুক্ত করা, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা তহবিল ও বৈজ্ঞানিক মনিটরিংসম্প্রসারণ, বিকল্প জীবিকাকে নীতি-স্তরে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা বৃদ্ধি, প্লাস্টিক ও শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর আইন প্রয়োগ এবং নির্দিষ্ট দূষণ-নিয়ন্ত্রণ মানদণ্ড স্থাপন, মেরিন প্রটেক্টেড এরিয়া সম্প্রসারণ ও কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা জাতীয় উন্নয়নের জন্য অমূল্য সম্পদ। কিন্তু এই সম্পদ টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক নীতি, বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ। সমন্বিত, তথ্যনির্ভর ও অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলতে পারলেই বাংলাদেশ সত্যিকারের ব্লু ইকোনমির যুগে প্রবেশ করতে পারবে—যা হবে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা ও জাতীয় উন্নয়নের দ্বৈত সাফল্য।