
‘সর্বনাশা পদ্মা নদী’ আব্দুল লতিফের লেখা গানটির মতো পদ্মা সবসমই সর্বনাশা। সেখানে ২.১ কি:মি দৈর্ঘ্যের একটি ব্যারেজ বানানো হবে রাজবাড়ীর জেলার পাংশা উপজেলায়। যা ভারতের ফারাক্কা বাঁধ থেকে প্রায় ২৫০ কি:মি দূরে। ভারতের দীর্ঘদিনের পানির ন্যায্যতার অবহেলা, বাংলাদেশের নতুন সরকারের দৃশ্যমান মেগা-প্রজেক্টের কারণস্বরূপ এবং দুদেশের সম্পর্কের টানটান উত্তেজনার মাঝে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন এক বাঁধ হলো প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজ। রূপক অর্থে, সম্পর্কে নতুন বাঁধ বলার কারণ হলো দুদেশের সম্পর্কে এখন বড় পরিমাপক হিসেবে থাকবে ২০২৬ এর ডিসেম্বরে শেষ হতে যাওয়া ৩০ বছরের গঙ্গা চুক্তি। এবং পদ্মা ব্যারেজকে যদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বানানো ব্যারেজ হিসেবে দেখি তাহলে ভুল হবে, এটি রাজনৈতিকও বটে।
ভারতের গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা বাঁধ অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণে তৈরি হয়েছিল। আজ তা ভারতের বিহার, মুর্শিদাবাদ, মালদা’র দুঃস্বপ্নের কারণ হলেও এই বাঁধ ভাঙা হয়নি। তিস্তার ক্ষেত্রেও একই বিষয়। এছাড়া মওলানা ভাসানীর ‘লংমার্চ টু ফারাক্কা’, ইন্দিরা গান্ধীকে চিঠিসহ রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি স্বত্বেও ভারত কখনই ন্যায্যতার হিসাব মেনে নেয় নি। শুধু তাই নয়, পৃথিবীর কোথাও আন্তর্জাতিক সীমানার ১৬.৫ কি:মি এ কোনো বাঁধ নেই, একমাত্র ফারাক্কা বাঁধ ছাড়া। এটি থেকে স্পষ্ট ফারাক্কা বাঁধের একটি বড় কারণ রাজনৈতিক।
লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো, প্রত্যেক রাজনৈতিক দল চায় তাদের নিজস্ব কিছু দৃশ্যমান মেগা-প্রজেক্ট থাকুক। যার দ্বারা জনগণের কাছে সেই সরকারের গ্রহণযোগ্যতা টিকে থাকে। আওয়ামী লীগের সময় জনগণের টাকায় পদ্মা সেতু এবং বিএনপির ২০২৬ এ এসে পদ্মা ব্যারেজ তারই অংশ। রাজনৈতিক স্বার্থও বড় কারণ এখানে।
তবুও প্রশ্ন এসে যায়, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাওয়া দীর্ঘ ৩০ বছরের চুক্তির আগেই পদ্মা ব্যারেজের অনুমোদন কি যৌক্তিক? এতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে প্রভাব পড়বে না?
১৯৭৫ সালে শুরু হওয়া ফারাক্কা বাঁধে একমাত্র আওয়ামী লীগ-ই ৩০ বছরের জন্য গঙ্গা চুক্তি করতে পেরেছিল। বাকী সময়ে কোনো সরকারই চুক্তি (Treaty) করতে পারেনি, স্বল্পকালীন সমঝোতা (Agreement) কিংবা সমঝোতা স্মারক (MoU) হয়েছে। এছাড়া ১৯৮৮-১৯৯৬ পর্যন্তই শুধু বাংলাদেশ-ভারতের ফারাক্কা বিষয়ক কোনো চুক্তি ছিল না। এদিকে ১৯৯১-১৯৯৬ পর্যন্ত সরকার ব্যবস্থায় ছিল বিএনপি। তাহলে ‘২৬ পরবর্তী সময়ের অপেক্ষায় না থেকে এই ব্যারেজ নির্মাণের সিদ্ধান্তকে পুরোপুরি প্রশ্নবিদ্ধ করা কঠিন। কেননা এখানে অনিশ্চয়তা বেশি।
ভারত বহুদিন ধরেই বলছে তারা এবার স্বল্পকালীন চুক্তি করবে। মনিরুজ্জামান মিঞা তার বই ‘Hydro-Politics of The Farakka Barrage’ এ লিখেছেন, “১৯৯৬ এ গঙ্গা চুক্তি এমনভাবে হয়েছিল যেন এটি আওয়ামী লীগ সরকারকে দেওয়ার জন্যই তৈরি করা হয়েছিল।”
এখন এটা বলা কঠিন যে ভারত ২০২৬ এর ডিসেম্বরের সাথে সাথেই নতুন চুক্তি করবে। ঠিক এই জায়গাতেই পদ্মা ব্যারেজ সম্পর্কে এক নতুন বাঁধ। কেননা নতুন চুক্তিতে এখন পদ্মা ব্যারেজ প্রাধান্য পাবে এবং ভারতের পানিকে অস্ত্রীকরণ বাধাগ্রস্ত হবে। এছাড়া নতুন এই চুক্তিতে দুদেশের সহযোগিতার মানসিকতা দুদেশের সম্পর্কের উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
দুঃখের বিষয় হলো, বাংলাদেশ কখনও নদীভিত্তিক মহাপরিকল্পনা নিতে পারেনি। এর একটা বড় কারণ বাংলাদেশের বেশিরভাগ নদী ভারত হয়ে আসা। ভাটির দেশ হওয়ায় গঙ্গার পলিমাটিতেই আমাদের দেশের অনেকাংশ সৃষ্টি। কিন্তু সকল আন্তঃসীমান্ত নদীর চুক্তি না থাকায় বাংলাদেশ পরিকল্পনায় সবসময় পিছিয়ে ছিল এবং এখনও আছে। এতে করে অভ্যন্তরীণ পানি নিরাপত্তায় ঘাটতি রয়েছে। যার কারণস্বরূপ নদীপথের দূরত্ব কমেছে যার অর্থনৈতিক ক্ষতি বিদ্যমান। পদ্মা ব্যারেজ এই দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা সমাধানের নতুন কৌশলগত সূচনা। এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান বলেন,
“পদ্মা ব্যারেজ বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে এবং অন্যান্য দেশের কূটনৈতিক অস্বস্তি স্বত্বেও এটি এগিয়ে নেওয়া উচিত। ব্যারেজ নির্মিত হলে ভারত বাংলাদেশের উপর তার রাজনৈতিক দর-কষাকষির ক্ষমতা হারাতে পারে, যেমন: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নদীগুলোর ক্ষেত্রে ভারতের মনোভাব এবং অনেকাংশে তা নেপাল ও চীনের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। ভারত পানি ভাগাভাগিকে সবসময়ই একটি ‘স্ট্র্যাটেজিক টুল‘ হিসেবে দেখবে, যেমনটি উজানের অধিকাংশ দেশ করে থাকে। যেটি বাংলাদেশকে বাধ্য করে পদ্মা ব্যারেজকে শুধু জীবিকার বিষয় নয় বরং একটি কৌশলগত স্বার্থ হিসেবে বিবেচনা করতে।’’
অর্থাৎ উজানের দেশগুলোর অবস্থানগত সুবিধা আছে তার ব্যবহারটুকুই করছে ভারত। বাংলাদেশ-ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে ভাটির দেশ বলে অসহযোগিতা ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর এবং বাংলাদেশ ধীরে ধীরে এর বিপরীতে দেশের ভেতরেই পানির নিরাপত্তার জন্য যা যা দরকার তা করবে ক্রমান্বয়ে। পদ্মা ব্যারেজ ৩ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি সংরক্ষণ করতে পারবে। এখন ভারত থেকে হুট করে পানি ছেড়ে দিলেও বাংলাদেশ একটু হলেও সময় পাবে তা ঠেকানোর। শুধু তাই নয়, দেশের টাকায় ৩৪,৪৯৭ কোটি টাকায় প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন হবে এবং বাকী কাজ বাকী সহযোগী দেশের সাহায্যে করা হবে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় চীন সেখানে বিনিয়োগ এবং সহযোগিতা করতে চেয়েছে। যেটি নির্ধারণ করে যে, দক্ষিণ এশিয়ায় ‘হাইড্রোপলিটিক্স’ নতুন মাত্রা পাচ্ছে। তাই এটি বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত প্রকল্প।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে উত্তেজনা বেড়েছে। এখন তাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ‘পুশ ইন’ তৎপরতা। ভারত থেকে বাঙালিদের বাংলাদেশী বলে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর কার্যক্রম। সব বাঙালীই বাংলাদেশী এবং তাদের মাঝে অনেকেই কয়েক দশক আগে থেকেই বসবাস করছে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোট দিয়েছে, তাদেরকেও পুশ করা হচ্ছে। কিছু কিছু বাংলাদেশী আছে অবৈধভাবে এটিও সত্য। কিন্তু তা হওয়া উচিত কূটনৈতিক আলোচনা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে। তাহলে ভারতের নোরেন্দ্র মোদির ‘Neighborhood First Policy’ এর সাথেও সাংঘর্ষিক হয়ে গেল না? যা অনেকক্ষেত্রে দুদেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বাধার সৃষ্টি করছে। এগুলো দুদেশের মাঝেই নতুন করে জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশের পদ্মা ব্যারেজ এখন একটি কাঠামোই নয়, এটি এখন জাতীয়তাবাদের অংশ।
বাংলাদেশের ফুসফুস সুন্দরবন ধ্বংসের এক বড় কারণ ফারাক্কা বাঁধ। খুলনার পাকশি কাগজ কল, গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প, অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরিতে পরিবেশবান্ধব জায়গার স্বল্পতা, মিঠা পানির অভাবে নতুন কলকারখানা স্থাপনে অসুবিধা, রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে তীব্র পানির সংকটে ভুগতে থাকা ঘোষিত অঞ্চল সামনে আসা, দেশের তাপমাত্রায় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে ফারাক্কা বাঁধ।
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ব ও সমুদ্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান এর মতে,
“১৯৯৭-২০১৬ পর্যন্ত ২০ বছরে, ভারত চুক্তি মোতাবেক পানি দেয়নি ৫২ শতাংশ এবং মার্চ-মে মাসে তা বেড়ে ৬৫ শতাংশ।” এছাড়াও তিনি বলেন, “১৯৬০ এর দশকে প্রত্যেক বছর প্রায় ২ বিলিয়ন টন পলিমাটি আসতো গঙ্গা নদী দিয়ে। এখন তা ৪০০-৬০০ মিলিয়ন টন। তবুও তার এক-তৃতীয়াংশ আটকে যায় ফারাক্কা বাঁধের আগে।”
আপনি এর প্রয়োজনীয়তা তখনই টের পাবেন যখন শুনবেন বাংলাদেশের বার্ষিক গড় বৃদ্ধি ১৫-২০ কি:মি, যা পলিমাটি আসার কারণেই বাড়তে থাকে এবং সে কারণেই আমরা নতুন দ্বীপ দেখতে পাই। ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গার পলিতে বাংলাদেশের সৃষ্টি অনেকটা। সেটি ধীর হয়েছে, এবং সেটা ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ। কেননা নদ-নদী শুকিয়ে গেছে ফারাক্কার বাঁধের কারণে, ভারতের অসহযোগিতার কারণে, অন্যায্যভাবে পানির অপসারণের কারণে।
বলে রাখা প্রয়োজন যে, ভারত শুধু গঙ্গার উপরে ৩৪ টির উপর বড় বড় প্রকল্প চালাচ্ছে। গঙ্গা চুক্তি-১৯৯৬ ধারা-১ এ বলা হয়েছে যে, গঙ্গার পানির পরিমাপ হবে ফারাক্কা বাঁধে। কিন্তু পানির পরিমাণ কমেছে তো অনেক আগেই। এতে করে ‘ডিফেন্ডারজ প্যারাডাইজ’ নামক ‘প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা’ শক্তি হারিয়ে ফেলছে বাংলাদেশ, যা বর্ষাকালে পাকিস্তানের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল ১৯৭১ এ।
ভারত পাকিস্তানের ইন্দাস ওয়াটার ট্রিটি স্থগিত করেছে, এখন প্রতিকূল সময়ে বাংলাদেশের সাথেও তারা এমন করবে না তার কোনো কারণ আছে? চিরকাল বন্ধুত্বের বিনিময়ে শঙ্কার উপহার এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশ পদ্মা ব্যারেজ করতে চায়। এবং এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়।
সবশেষে, বাংলাদেশের উচিত UN Water Courses Convention-এ স্বাক্ষর করা। যা আন্তর্জাতিকভাবে পানির ন্যায্যতার হিসাবে সহায়ক হবে এবং ‘হাইড্রো-ডিপ্লোম্যাসি’ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে সংযোজন জরুরি। এছাড়া, গঙ্গা চুক্তিতেই থেমে না থেকে আরও ৫৩ টি আন্তঃসীমান্ত নদীর জন্যও গুরুত্বের সাথে চুক্তি ত্বরান্বিত করার উপযুক্ত সময়।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বহুদিনের। এই ইতিহাসে সম্পর্কের অবনতি কাম্য নয়। দীর্ঘ এই সম্পর্ক টিকে থাকুক ন্যায্যতা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে। বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে ভারতের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে, এখন ভারতের সাহায্যও গুরুত্বপূর্ণ। এতে উপকৃত হবে দুটি দেশই।
খন্দকার সিহাবুর রহমান
রিসার্চ এসোসিয়েট, ওয়াটার এন্ড রিভার ম্যানেজমেন্ট,
প্রজেক্ট উপকূল